কপিরাইট ট্রেডমার্ক রেজিস্ট্রেশন করার সরকারি ফি ও নিয়ম

 


নিজের লেখা, ছবি, সফটওয়্যার, গান, ভিডিও কিংবা অন্যান্য সৃজনশীল কাজ সুরক্ষিত রাখতে কপিরাইট রেজিস্ট্রেশন গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে ব্যবসার নাম, ব্র্যান্ডের নাম, লোগো, পণ্য বা সেবার পরিচিতি সুরক্ষিত রাখতে প্রয়োজন হতে পারে ট্রেডমার্ক রেজিস্ট্রেশন

বাংলাদেশে কপিরাইটের নিবন্ধন বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের মাধ্যমে এবং ট্রেডমার্ক নিবন্ধন পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (DPDT)-এর মাধ্যমে করা হয়। কপিরাইট নিবন্ধনের আইনি ভিত্তি বর্তমানে কপিরাইট আইন, ২০২৩; আর ট্রেডমার্কের জন্য ট্রেডমার্কস আইন, ২০০৯ প্রযোজ্য।

কপিরাইট ও ট্রেডমার্কের মধ্যে পার্থক্য

কপিরাইট মূলত সৃজনশীল কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত। যেমন:

  • বই ও লেখা

  • ব্লগ/আর্টিকেল

  • ছবি ও গ্রাফিক্স

  • গান ও সংগীত

  • চলচ্চিত্র/ভিডিও

  • সফটওয়্যার

  • অন্যান্য সৃজনশীল কর্ম

অন্যদিকে ট্রেডমার্ক কোনো ব্যবসার ব্র্যান্ড পরিচয় সুরক্ষায় ব্যবহৃত হয়। যেমন:

  • ব্যবসার নাম

  • ব্র্যান্ড নাম

  • লোগো

  • পণ্য বা সেবার নির্দিষ্ট পরিচিতি

  • নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ব্যবহৃত মার্ক

কপিরাইট রেজিস্ট্রেশনের সরকারি ফি

বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের বর্তমান Citizen's Charter অনুযায়ী সাধারণ কপিরাইট রেজিস্ট্রেশনের সরকারি ফি ১,০০০ টাকা। এই ফি ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে অথবা অনলাইন e-Copyright System-এর মাধ্যমে পরিশোধ করা যায়।

কপিরাইট রেজিস্ট্রেশনের জন্য সাধারণভাবে প্রয়োজন হতে পারে:

  1. নির্ধারিত আবেদনপত্র

  2. সৃজনশীল কাজের ২ কপি

  3. আবেদনকারীর NID/পাসপোর্টের কপি

  4. পাসপোর্ট সাইজের ছবি

  5. নির্ধারিত ফি পরিশোধের প্রমাণ

  6. কাজটি মৌলিক—এমন ঘোষণাসহ প্রয়োজনীয় অঙ্গীকারনামা

প্রতিষ্ঠানের নামে আবেদন করলে প্রতিষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী অতিরিক্ত কাগজপত্র, যেমন Memorandum, Trade License, TIN এবং আয়কর রিটার্নের প্রাপ্তিস্বীকারপত্র প্রয়োজন হতে পারে।

কপিরাইট আবেদন করার পদ্ধতি

প্রথমে নির্ধারিত ফরম পূরণ করে বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের অনলাইন পোর্টালে আবেদন করা যায়। অনলাইনে আবেদন করার পর প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের হার্ড কপি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কপিরাইট অফিসে পাঠাতে হয়।

কপিরাইট অফিসের তথ্য অনুযায়ী, হার্ড কপি দাখিলের পর বিধি অনুযায়ী অপেক্ষাকাল শেষ হলে এবং কাগজপত্র সঠিক পাওয়া গেলে রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।

কপিরাইট হস্তান্তর বা চুক্তিপত্রের ফি

কোনো কপিরাইটের মালিকানা হস্তান্তর বা চুক্তিপত্র নিবন্ধনের জন্য বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের Citizen's Charter-এ ৮০০ টাকা সরকারি ফি উল্লেখ আছে। এর সঙ্গে নির্ধারিত চুক্তিপত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হয়।

ট্রেডমার্ক রেজিস্ট্রেশনের সরকারি ফি

বাংলাদেশে ট্রেডমার্ক রেজিস্ট্রেশনের আবেদন DPDT-এর মাধ্যমে করা হয়। DPDT-এর ওয়েবসাইটে ট্রেডমার্কের জন্য TM-1, TM-4, TM-9, TM-11, TM-12সহ বিভিন্ন ফরমের ব্যবস্থা রয়েছে এবং অনলাইন আবেদনের সুবিধাও রয়েছে।

২০২৬ সালের সাম্প্রতিক প্রকাশিত ফি-তথ্য অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ফিগুলোর মধ্যে রয়েছে:

ফরমকাজসরকারি ফি
TM-1ট্রেডমার্ক নিবন্ধনের আবেদন৫,০০০ টাকা
TM-4ট্রেডমার্ক অনুসন্ধান২,০০০ টাকা
TM-9ট্রেডমার্ক জার্নালে প্রকাশ৩,০০০ টাকা
TM-11নিবন্ধন/সনদ সংক্রান্ত আবেদন২০,০০০ টাকা
TM-12ট্রেডমার্ক নবায়ন২০,০০০ টাকা

উপরের ফিগুলো সাম্প্রতিক ২০২৬ সালের প্রকাশিত ফি-তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ; তবে DPDT-এর সরকারি ফি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই আবেদন জমা দেওয়ার দিন DPDT-এর বর্তমান ফি শিডিউল যাচাই করা উচিত।

ট্রেডমার্ক রেজিস্ট্রেশনের নিয়ম

ট্রেডমার্ক নিবন্ধনের আগে প্রথম কাজ হলো আপনার প্রস্তাবিত নাম বা লোগোর সঙ্গে একই বা কাছাকাছি কোনো নিবন্ধিত মার্ক রয়েছে কি না তা যাচাই করা।

ধাপ ১: ট্রেডমার্ক সার্চ

প্রয়োজনে TM-4 ব্যবহার করে প্রস্তাবিত ট্রেডমার্কের অনুসন্ধান করা যায়। এতে একই বা কাছাকাছি মার্ক আগে থেকে রয়েছে কি না সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

ধাপ ২: সঠিক Class নির্বাচন

আপনার পণ্য বা সেবার ধরন অনুযায়ী সঠিক ট্রেডমার্ক Class নির্বাচন করতে হবে। ভুল Class নির্বাচন করলে ভবিষ্যতে ব্র্যান্ড সুরক্ষায় সমস্যা হতে পারে।

ধাপ ৩: TM-1 দিয়ে আবেদন

প্রস্তাবিত নাম, লোগো বা মার্কের জন্য TM-1 ফরমে আবেদন করতে হয়। DPDT বর্তমানে অনলাইনেও TM-1 আবেদন গ্রহণ করছে।

ধাপ ৪: DPDT-এর পরীক্ষা

আবেদন জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আবেদন পরীক্ষা করে। কোনো আপত্তি থাকলে আবেদনকারীকে নির্ধারিত পদ্ধতিতে তার জবাব দিতে হতে পারে।

ধাপ ৫: ট্রেডমার্ক জার্নালে প্রকাশ

আবেদন গ্রহণযোগ্য হলে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় ট্রেডমার্ক জার্নালে প্রকাশ করা হয়। এই পর্যায়ে তৃতীয় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইন অনুযায়ী আপত্তি বা বিরোধিতা করতে পারে।

ধাপ ৬: রেজিস্ট্রেশন ও সনদ

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো কার্যকর বিরোধিতা না থাকলে অথবা বিরোধিতা নিষ্পত্তির পর ট্রেডমার্ক নিবন্ধনের পরবর্তী ধাপ সম্পন্ন হয় এবং নিবন্ধন সনদ দেওয়া হয়।

কত টাকা খরচ হতে পারে?

ট্রেডমার্কের ক্ষেত্রে শুধু TM-1 আবেদন ফি দিলেই পুরো সরকারি প্রক্রিয়া শেষ হয় না। অনুসন্ধান, জার্নাল প্রকাশ, নিবন্ধন সনদ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ধাপ অনুযায়ী অতিরিক্ত সরকারি ফি থাকতে পারে।

এছাড়া কোনো আইনজীবী, ট্রেডমার্ক এজেন্ট বা কনসালট্যান্টের মাধ্যমে কাজ করালে তাদের Professional/Service Fee আলাদা হবে। তাই কোনো প্রতিষ্ঠানকে টাকা দেওয়ার আগে জিজ্ঞেস করা উচিত—সরকারি ফি এবং সার্ভিস চার্জ কোনটি।

কপিরাইট নাকি ট্রেডমার্ক—কোনটি করবেন?

আপনার প্রয়োজনের ওপর বিষয়টি নির্ভর করবে।

আপনি যদি নিজের লেখা, ছবি, সফটওয়্যার, ভিডিও বা অন্য কোনো সৃজনশীল কাজ সুরক্ষিত করতে চান → কপিরাইট।

আপনি যদি ব্যবসার নাম, ব্র্যান্ড নাম বা লোগো সুরক্ষিত করতে চান → ট্রেডমার্ক।

একই ব্যবসার ক্ষেত্রে দুটিই প্রয়োজন হতে পারে। যেমন, একটি কোম্পানির লোগো/ব্র্যান্ড নাম ট্রেডমার্কের আওতায় এবং কোম্পানির তৈরি বিজ্ঞাপনের ভিডিও, লেখা বা গ্রাফিক্স কপিরাইটের আওতায় পড়তে পারে।

কোথায় আবেদন করবেন?

কপিরাইটের জন্য বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের অনলাইন e-Copyright System ব্যবহার করা যায়।

ট্রেডমার্কের জন্য DPDT-এর অনলাইন আবেদন ব্যবস্থা রয়েছে এবং TM-1, TM-4, TM-9 ইত্যাদি ফরম অনলাইনে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

রেজিস্ট্রেশনের আগে আপনার ব্র্যান্ড নাম বা লোগো আগে থেকেই অন্য কেউ ব্যবহার বা নিবন্ধন করেছে কি না যাচাই করা ভালো। বিশেষ করে ব্যবসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নাম হলে শুধু Facebook Page, Domain বা Trade License নেওয়াকে ট্রেডমার্ক সুরক্ষার বিকল্প মনে করা উচিত নয়।

সরকারি ফি ও নিয়ম পরিবর্তিত হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি ওয়েবসাইটে সর্বশেষ ফি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করা উচিত।

উপসংহার

বাংলাদেশে সৃজনশীল কাজের আইনি সুরক্ষার জন্য কপিরাইট রেজিস্ট্রেশন এবং ব্যবসার ব্র্যান্ড পরিচয় সুরক্ষার জন্য ট্রেডমার্ক রেজিস্ট্রেশন গুরুত্বপূর্ণ। কপিরাইট রেজিস্ট্রেশনের সাধারণ সরকারি ফি বর্তমানে ১,০০০ টাকা, আর ট্রেডমার্কের ক্ষেত্রে আবেদন ও পরবর্তী ধাপ অনুযায়ী আলাদা সরকারি ফি প্রযোজ্য হয়।

সঠিক Class নির্বাচন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত এবং আবেদন করার আগে বিদ্যমান মার্ক/কাজ যাচাই করলে রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া অনেক সহজ হয়।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url